সুনামগঞ্জের হাসাউরার আনারসে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে
সংগৃহীত ছবি
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ০১:৪০ | আপডেট: ২২ জুন ২০২৬ | ০১:৪০
সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী টিলাভূমিতে উৎপাদিত ‘হাসাউড়ার আনারস’ এখন জেলার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুপরিচিত একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। স্বাদ, গন্ধ ও গুণগত মানে অনন্য এই আনারস চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। একই সঙ্গে দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এ ফল।
জেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের হাসাউড়া, রসুলপুর, দর্পগ্রাম, পেচাকোনা ও বনগাঁও এলাকায় বিস্তৃত টিলাভূমিজুড়ে আনারসের বাগান চোখে পড়ে। এসব এলাকার বহু পরিবার বছরের পর বছর ধরে আনারস চাষের সঙ্গে জড়িত। সীমান্তঘেঁষা পূণ্যনগর এলাকার পাহাড়ি জনপদ এবং আশপাশের সবুজ টিলাগুলোতে এখন শুধুই আনারসের সমারোহ।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ‘হাসাউড়ার আনারস’ নামে পরিচিত এই ফলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কৃষি বিভাগের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে আন্তর্জাতিক বাজারেও এ আনারস রপ্তানির উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্ষা মৌসুম এলেই হাসাউড়া এলাকার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে পাকা আনারসের মিষ্টি সুবাস। মে মাস থেকে ফল সংগ্রহ শুরু হলেও জুনজুড়ে চলে বেচাকেনার ব্যস্ততা। প্রতিদিন ভোর থেকে কৃষকরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাগানে পাকা আনারস সংগ্রহ করেন। বিকেল পর্যন্ত চলে বাছাই, বিক্রি ও পরিবহনের কাজ।
হাসাউড়ায় মূলত ‘হানিকুইন’ জাতের আনারস চাষ করা হয়। এ জাতের আনারসে আঁশ কম, রস বেশি এবং স্বাদে-গন্ধে অন্য জাতের তুলনায় বেশ আলাদা। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাগানে এসে আনারস সংগ্রহ করছেন।
আনারস চাষি নিতাই চন্দ্র দাস বলেন, “হাসাউড়ার আনারসের স্বাদ ও গুণগত মান খুবই ভালো। এটি মিষ্টি, সুস্বাদু ও রসালো। বাজারে হাসাউড়ার আনারসের নাম শুনলেই ক্রেতারা আগ্রহ নিয়ে ক্রয় করেন। বাগানে আনারস পুরোপুরি পেকে গেলেই আমরা সংগ্রহ শুরু করি।”
তিনি জানান, “প্রতিবছর মে মাস থেকে আনারস পাকতে শুরু করে এবং জুন মাস পর্যন্ত বিক্রয় চলে।”
কৃষকদের ভাষ্য, একটি মানসম্মত আনারস উৎপাদনে কয়েক মাসের নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন হয়। চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সেচ ও বাগান ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে শ্রম ও যত্নের বিকল্প নেই। তবে উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশই শ্রমিকের মজুরি।
চাষি ইসলাম উদ্দিন বলেন, “এবার আনারসের ফলন ভালো হয়েছে। হাসাউড়ার আনারস দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, খেতেও তেমনি সুস্বাদু। যারা একবার এ আনারস খায়, তারা বার বার এর খোঁজে আসেন।”
রাসায়নিক সার ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা আনারস চাষে কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করি না।
মূলত আগাছা পরিষ্কার করা এবং বাগানের নিয়মিত পরিচর্যাই আমাদের কাজ। প্রাকৃতিক পরিবেশেই আনারস বড় হয় এবং এর স্বাদ ও গুণগত মান বজায় থাকে।”
স্থানীয়দের মতে, সরকারি সহায়তা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ফল সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলে আনারসের উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মামুন মল্লিক বলেন, “আমরা প্রতিবছর হাসাউড়ার আনারস খেতে আসি। নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি বাড়ির জন্যও নিয়ে যাই। এমন স্বাদের আনারস অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।”
দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিরুল হক বলেন, “হাসাউড়ার পাশে লক্ষীপুর ইউনিয়নে আরও কিছু টিলায় আনারস চাষের উপযোগী ভূমি রয়েছে। বিশেষ করে মাঠগাঁও এবং এর আশপাশের এলাকা। কৃষি অফিস উদ্যোগী হলে ওখানেও চাষীদের দিয়ে আনারস চাষ করানো যেতে পারে বলে তিনি বলেন।”
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বাসিন্দা মো. বুরহান উদ্দিন বলেন, “হাসাউড়ায় বর্তমানে যে পরিমাণ আনারস উৎপাদিত হচ্ছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এ আনারস মূলত টিলাভূমিতে চাষ করা হয়।”
রঙ্গারচর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বলেন, “এ সব এলাকায় এখনও অনেক টিলা পতিত অবস্থায় রয়েছে। কৃষকরা যদি প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা ও প্রণোদনা পান, তাহলে এসব পতিত টিলায় আনারসের আবাদ সম্প্রসারণ করে উৎপাদন করা সম্ভব।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাসাউড়া এলাকায় প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে হানিকুইন জাতের আনারসের আবাদ হয়েছে। উৎপাদিত আনারসের মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাগান থেকে সংগ্রহ করছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে মিষ্টি ও রসালো ফলের চাহিদা থাকায় এ আনারস রপ্তানিরও সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বাসস’কে বলেন, “হাসাউড়া এলাকার বিভিন্ন টিলায় প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে হানিকুইন জাতের আনারসের আবাদ হয়েছে। এই জাতের আনারস অত্যন্ত সুমিষ্ট ও সুস্বাদু হওয়ায় সারাদেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আনারস চাষে স্থানীয় কৃষকদেরও যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। বাজারে এই আনারসের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।”
এদিকে হাসাউড়ার আনারসকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বাসস’কে বলেন, “হাসাউড়ার আনারসকে জিআই পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগই নেয়া হবে। হাসাউড়ার আনারস চাষে আরও বেশি গুরুত্ব দেয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।”
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা, বাজার সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি সুযোগ তৈরি করা গেলে ‘হাসাউড়ার আনারস’ দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
