বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

সৌর সেচে বদলাচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি, কমছে উৎপাদন ব্যয়

সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:৫৩ | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:৫৪

সরকারি উদ্যোগে সৌরশক্তিচালিত সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে দেশের কৃষি খাতে। বিশেষ করে খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে সৌরচালিত পাম্প ব্যবহারের ফলে কৃষকদের সেচ ব্যয় কমার পাশাপাশি বাড়ছে ফসল উৎপাদন। একই সঙ্গে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও ডিজেলনির্ভরতা কমিয়ে কৃষিকে আরও টেকসই করার উদ্যোগ এগিয়ে যাচ্ছে।

রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় গত দুই বছরে ৩২টি সৌরচালিত সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ-সুবিধাবঞ্চিত, খরাপ্রবণ ও দুর্গম এলাকায় স্থাপিত এসব পাম্পের ফলে কৃষকদের সেচ ব্যয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, এর ফলে ফসলের নিবিড়তাও প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

‘রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় বরেন্দ্র অঞ্চলে সৌরশক্তিচালিত সেচ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং পানির সাশ্রয়ী ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) যৌথভাবে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের ৬৭টি উপজেলার প্রায় ৩ হাজার ২০০ কৃষক সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা।

ডিজেল ও জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের সেচব্যবস্থায় স্বনির্ভর করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকদের আর্থিক চাপ কমাতে তাঁদের বিনা মূল্যে সৌরচালিত সেচ প্রযুক্তির সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিকে আধুনিক ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলার চেষ্টা চলছে।

তিন ধরনের সৌর সেচব্যবস্থা

প্রকল্পের আওতায় তিন ধরনের সৌর সেচব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে—ফিক্সড, পোর্টেবল ও প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন। প্রতিটি পদ্ধতি কৃষিজমির ধরন ও সেচের প্রয়োজন বিবেচনায় ব্যবহার করা হচ্ছে।

ফিক্সড সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থায় দুই অশ্বশক্তির মোট ২৪টি স্থায়ী সেচ প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্ল্যান্টের মাধ্যমে নির্ধারিত জমিতে নিয়মিত সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

অন্যদিকে, জমি ও বাগানের অবস্থান অনুযায়ী সেচের সুবিধা নিশ্চিত করতে স্থাপন করা হয়েছে আটটি পোর্টেবল সোলার ইরিগেশন ইউনিট। সহজে বহন ও স্থানান্তরযোগ্য এসব ইউনিট এক জমি থেকে অন্য জমিতে কিংবা বিভিন্ন প্লট ও বাগানে নিয়ে ব্যবহার করা যায়।

ফলবাগানে সেচের কার্যকারিতা বাড়াতে স্থাপন করা হয়েছে ১০টি প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন ইউনিট। প্রতিটি ইউনিট এক একর আয়তনের নির্দিষ্ট ফলবাগানের জন্য পরিকল্পিত। এ ব্যবস্থায় সৌরচালিত পাম্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ড্রিপ ইরিগেশন বা ফোঁটা ফোঁটা সেচপ্রযুক্তি।

পানি সাশ্রয়ে ড্রিপ ইরিগেশন

বরেন্দ্র অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে খরা ও পানিসংকটের জন্য পরিচিত। এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় কৃষিকাজে পানির দক্ষ ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কৃষিবিদদের মতে, সেচের পানির অপচয় কমাতে আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।

প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থায় পাইপের মাধ্যমে সরাসরি গাছের গোড়ায় ফোঁটা ফোঁটা পানি পৌঁছে দেওয়া হয়। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী গাছের শিকড়ে আর্দ্রতা সরবরাহ করা যায় এবং পানির অপচয় কমানো সম্ভব হয়। পাশাপাশি মাটির উপরিভাগের আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে এবং আগাছার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, এর ফলে ফলের উৎপাদন ও গুণগত মান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছেন মাঠপর্যায়ের কৃষকেরাও। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার উপকারভোগী কৃষক মো. আলমগীর হোসেন জানান, আগে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে জমি ও বাগানে সেচ দিতে গিয়ে তাঁকে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হতো। উৎপাদন খরচের বড় অংশই চলে যেত সেচের পেছনে। সেচ মৌসুমে চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় সমস্যাও হতো।

আলমগীর হোসেন বলেন, সরকারের সহায়তায় এখন সৌরশক্তি ব্যবহার করে সহজেই বাগানে সেচ দিতে পারছেন। এতে খরচ ও পানির অপচয় কমেছে। একই সঙ্গে গাছের পরিচর্যা করাও আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

সেচ ব্যয় কমায় বাড়ছে ফসলের নিবিড়তা

সৌরচালিত সেচব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন কৃষি কর্মকর্তারাও। রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান বলেন, মাঠপর্যায়ে এ প্রযুক্তির সুফল ও কার্যকারিতা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তীব্র খরা ও পানিসংকটপূর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চলে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড কিংবা আমদানিনির্ভর ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

‘রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর পরিচালক ও কৃষিবিদ এস এম হাসানুজ্জামান জানান, গত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৩২টি সৌরচালিত সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এতে কৃষকদের সেচ ব্যয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলের গভীর নলকূপগুলোর কার্যক্ষমতা কমে গিয়েছিল। সৌরচালিত পাম্প চালুর ফলে অনাবাদি ও পতিত জমিতে বছরে তিনটি ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে পাম্পগুলো ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কৃষি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, ডিজেলচালিত পাম্পের বিকল্প হিসেবে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়লে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এবং জ্বালানি আমদানির চাপ কমানো সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তন, পানিসংকট ও কৃষি উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক সেচপ্রযুক্তি বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিকে আরও সাশ্রয়ী ও টেকসই করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এ প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করতে পাম্পের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির সুষম ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন

© 2026 Krishi Barta
ফলো করুন কৃষি বার্তা - খবর