বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

বাজারদরের তাৎক্ষণিক তথ্যে সবজি কৃষকদের দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়ছে

সংগৃহীত । প্রতীকী ছবি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৩৯ | আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৩৯

মোবাইল ফোনের মাধ্যমে গ্রামীণ সবজি চাষিরা এখন শহরের বাজারে তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের তাৎক্ষণিক দাম জানতে পারছেন। দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সবজির বাজার বগুড়ার মহাস্থানের কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এ তথ্যের কারণে তাঁরা উৎপাদিত সবজির সম্ভাব্য দাম সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা নিয়েই বাজারে আসতে পারছেন।

তাঁদের মতে, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পণ্যের দাম সম্পর্কে সহজে তথ্য পাওয়ায় দর-কষাকষির সক্ষমতা বেড়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সবজির দাম নির্ভর করে সরবরাহ ও চাহিদার ওপর।

উন্নয়নবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল সংযোগের ফলে বাজারসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। সবজি চাষিরা এখন প্রায়ই ফসল কাটার আগে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ফোনকল ও খুদে বার্তার (এসএমএস) সহায়তা নেন।

বগুড়া সদর উপজেলার রহমতবালা গ্রামের কৃষক মো. আমিনুল ইসলাম (৩৬) এক একর জমিতে মূলা, লাউ, কুমড়া ও বরবটি চাষ করেছেন। গত ২ অক্টোবর তিনি মহাস্থান সবজি বাজারে মূলা নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, “তিন দিন আগে আমি জানতাম প্রতি মণের (৪০ কেজি) দাম প্রায় ১ হাজার টাকা ছিল, কিন্তু আজ তা প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় নেমে গেছে। এটি বেশি সরবরাহের কারণে। গরম আবহাওয়ায় চাষ করলে এই সবজির মানও কখনো কখনো ভালো হয় না।”

তিনি আরও বলেন, “কৃষকরা দাম ঠিক করার জন্য একত্রিত হতে পারেন না। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মোবাইল ফোন আছে, তাই উভয়েই সরবরাহ ও চাহিদা সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন।”

শিবগঞ্জের উথলী গ্রামের রাব্বি মোল্লা (২৫) এবার প্রায় ৫০ শতক জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করেছেন। ক্ষেত থেকে সবজি সংগ্রহের আগে অন্য কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য দাম সম্পর্কে ধারণা নেন তিনি।

রাব্বি মোল্লা বলেন, “আমি ক্ষেত থেকে কিছু ফুলকপি বিক্রি করেছি। আমি এখানে (মহাস্থানে) আসি বেশি দামের আশায়। কখনো দাম বাড়ে, কখনো কমে। যখন ঢাকা বা অন্যান্য শহরে সবজির চাহিদা বাড়ে, তখন পাইকার ও ব্যবসায়ীরা আমাদের ভালো দাম দেন।”

বাজারদরের পরিস্থিতি বুঝে অনেক পাইকার কৃষকদের কাছ থেকে মৌসুমি সবজি কিনে মহাস্থানভিত্তিক আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন। এসব আড়তদার পরে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরের ব্যবসায়ীদের কাছে পাইকারি দরে সবজি সরবরাহ করেন।

এমনই একজন ব্যবসায়ী শিবগঞ্জের বিচোক গ্রামের মাসুম ইসলাম (২৭)। তিনি বলেন, “আমি আজ কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ ১ হাজার ৬০০ টাকায় করলা কিনেছি, ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করার আশা করছি। আমরা লাভজনক দামে কেনাবেচা করতে সমস্যায় পড়ি, কারণ আগে থেকে সঠিক দাম জানতে পারি না।”

মাসুম ইসলাম জানান, মহাস্থানের পাইকাররা শহরের পাইকারদের কাছ থেকে পাওয়া অর্ডার ও বাজারে সবজির সরবরাহের ওপর নির্ভর করে পণ্য কেনেন। বর্তমানে শসা, বেগুন, ঝিঙে, কুমড়া, বরবটি ও জলপাই প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে।

বগুড়ার লাহিড়ীপাড়ার আবদুল হামিদ প্রামাণিক (৪৮) প্রায় এক দশক ধরে সবজির পাইকারি ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, “সরবরাহ যত বেশি, আমাদের লাভজনকতাও তত বেশি। কিন্তু যখন ঢাকায় চাহিদা বেশি থাকে, কৃষকরাও বেশি দাম চান। সবাই ফোন বা ফেসবুকের মাধ্যমে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নজর রাখে। কৃষকরা এখন যেকোনো দাম বৃদ্ধির একটি অংশ পান।”

মহাস্থান বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে বিভিন্ন শহরে সবজি সরবরাহ করা হয়। সেখানে প্রায় ২০০ জন পাইকার ও ৭০ জন পাইকারি ব্যবসায়ী বা বাণিজ্যিক আড়তের মালিক রয়েছেন। তাঁদের একজন আল-মামুন (৪০), যিনি সাম মাইশা ট্রেডার্স নামের একটি আড়তের মালিক।

আল-মামুন বলেন, কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীদের মোবাইল ফোনের ব্যবহার কৃষিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে কৃষকদের ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, “এটি ব্যবসায় প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করেছে। এখন কৃষকের বিক্রয়মূল্য ও পাইকারি দরের মধ্যে বিশাল পার্থক্য দেখা যায় না। অবশ্যই যেকোনো দাম বৃদ্ধি ভোক্তাদের প্রভাবিত করে, কিন্তু কৃষকরা উপকৃত হন।”

ঢাকার মিরপুরের বিশাল ভাণ্ডার পাইকারি আড়তের প্রতিনিধি হেফজুল বারী ফকির (৪০) মহাস্থানেই থাকেন। তিনি বলেন, “আমি প্রতিদিন সকালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঢাকা থেকে সবজির চাহিদার পাশাপাশি সম্ভাব্য দামের নির্দেশনা পাই। এরপর কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সবজি কিনে ঢাকায় পরিবহন করি। কিন্তু অনেক সময় ঢাকা থেকে দেওয়া দামে সবজি কেনা যায় না। আবার কখনো কখনো সম্ভাব্য দামের চেয়েও কম দামে কিনতে পারি। মূলত সবজির সরবরাহ কমবেশি হওয়ার কারণেই এমনটা ঘটে।”

তিনি আরও বলেন, “কৃষকদের বাজারের তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাঁরা যে ব্যক্তি ভালো দাম দেন, তাঁর কাছেই পণ্য বিক্রির চেষ্টা করেন। উৎপাদন কমে গেলে অথবা যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হলে সবজির দাম বেড়ে যায়।”

সবজি পচনশীল পণ্য হওয়ায় দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর আগেই উৎপাদিত সবজির প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এখন দ্রুত বাজারদরের তথ্য পেতে পারায় অল্প সময়ে সবজি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে সবজির অপচয় কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন

© 2026 Krishi Barta
ফলো করুন কৃষি বার্তা - খবর