মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ইউরিয়া সারের অপচয় রোধে নতুন দিগন্ত

ইউরিয়া সারের অপচয় রোধে নতুন দিগন্ত

বাকৃবি প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:৪১ | আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১০:০০

বাংলাদেশের কৃষিতে দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় সমস্যা হলো ইউরিয়া সারের অপচয়। মাঠে প্রয়োগ করা ইউরিয়ার প্রায় ৬০ শতাংশই গাছ গ্রহণ করতে পারে না। ফলে একদিকে যেমন কৃষকের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ঝুঁকি বাড়ে।


এই সংকটের টেকসই সমাধানে আশার আলো দেখিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। তারা প্রথমবারের মতো ন্যানো বায়োচার (কার্বন) সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া সার উদ্ভাবনের দাবি করেছেন, যা ব্যবহার করলে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমানো সম্ভব।


কী এই ন্যানো বায়োচার সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া?
গবেষক দলের প্রধান, বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসান জানান—
“আমরা দুইটি পদ্ধতিতে ২০–৫০ ন্যানোমিটার আকারের ন্যানো ইউরিয়া তৈরি করেছি। এতে ন্যানো কার্বন বা বায়োচার কোটিং দেওয়া হয়েছে, যা ইউরিয়ার নাইট্রোজেন ধীরে ধীরে মুক্ত করে।”
এই স্লো-রিলিজ (Slow release) প্রক্রিয়ার ফল গাছ প্রয়োজন অনুযায়ী নাইট্রোজেন পায়,অপচয় কমে। বায়োচার কোটেড ন্যানো ইউরিয়া পরিবেশবান্ধব। এর ফলে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমে যায়। কম সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
গবেষণায় সফলভাবে তিনটি ন্যানো হাইব্রিড ম্যাটেরিয়াল তৈরি করা হয়েছে—
১.হাইড্রক্সি অ্যাপাটাইট–ইউরিয়া
২. ইউরিয়া–ন্যানো বায়োচার
৩. হাইড্রক্সি অ্যাপাটাইট–ইউরিয়া–ন্যানো বায়োচার
- TEM বিশ্লেষণে কণার আকার পাওয়া গেছে ৩০–৩২ ন্যানোমিটার, যা গাছের কোষে সহজে প্রবেশ করতে সক্ষম।FTIR বিশ্লেষণে শক্তিশালী রাসায়নিক বন্ধন ও ফাংশনালাইজেশন নিশ্চিত হয়েছে।
বর্তমানে যেখানে প্রচলিত ইউরিয়া ব্যবহারের দক্ষতা মাত্র ৩০–৪০ শতাংশ, সেখানে এই ন্যানো ইউরিয়ার মাধ্যমে ৭৫–৮৫ শতাংশ পর্যন্ত নাইট্রোজেন ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।

কৃষক ও পরিবেশের জন্য কী সুবিধা?
✅ ইউরিয়া সাশ্রয়:
-ইউরিয়া ব্যবহার কমবে ২৫% বা তার বেশি।
-সরকারের ভর্তুকির চাপ কমবে।
-কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে।
✅ ফলন ও গুণগত মান বৃদ্ধি:
-ধানের ফলন বাড়বে ১০–২৫%।
-প্রোটিনের পরিমাণ বাড়বে ৮–১২%।
-ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত হবে।
✅ পরিবেশ সুরক্ষা:
-অ্যামোনিয়া অপচয় কমবে ৮০–৯০%।
-নাইট্রেট লিচিং কমবে ৬৫–৭৫%।
-নাইট্রাস অক্সাইড নির্গমন কমবে ৪০–৫০%।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন?
 বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২.৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন ইউরিয়া সার ব্যবহৃত হয়।
 অতিরিক্ত সার ব্যবহারে মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ বাড়ছে।
ন্যানো বায়োচার কোটেড ইউরিয়া ব্যবহারে জমির স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুস ছালাম বলেন—
“ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহার করলে একদিকে ইউরিয়ার পরিমাণ কম লাগবে, অন্যদিকে পরিবেশ সুরক্ষিত হবে এবং উৎপাদন ব্যয় কমে যাবে।”


গবেষণায় যারা যুক্ত ছিলেন
অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসান (বাকৃবি)
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ খোরশেদ আলম (বুয়েট)
ড. শেখ মনজুরা হক (বিএইসি)
অধ্যাপক ড. তাহসিনা শারমিন হক (বাকৃবি)
পিএইচডি ফেলো মো. আমজাদ হোসেন
শিক্ষার্থী মো. রোকনুজ্জামান রিপন (বুয়েট)
গবেষণাটি কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ) এর অর্থায়নে ২০২৩ সাল থেকে পরিচালিত হচ্ছে।


সামনে কী?
মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষা এখনো বাকি। আশা করা হচ্ছে, আগামী বোরো মৌসুমের পরেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হবে। সফল হলে এটি হতে পারে বাংলাদেশের কৃষিতে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক।
ন্যানো বায়োচার সমৃদ্ধ ন্যানো ইউরিয়া শুধু একটি সার নয় বরং এটি কৃষকের লাভ, পরিবেশের সুরক্ষা এবং টেকসই কৃষির ভবিষ্যৎ।

আরও পড়ুন

© 2026 Krishi Barta
ফলো করুন কৃষি বার্তা - খবর